মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
সর্ব-শেষ হাল-নাগাদ: ২৪ নভেম্বর ২০১৬

বন্যা নিয়ন্ত্রণ

বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প


 

বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প (Flood Control, Drainage and Irrigation Projects)  অনুচ্চ ভূ-সংস্থানের কারণে একটি স্বাভাবিক বৎসরে বাংলাদেশের ভৌগোলিক এলাকার কমপক্ষে ২০% এলাকা বন্যা কবলিত হয়ে থাকে। ১৯৯৮ সালের মতো মারাত্মক পর্যায়ে গেলে বন্যা কবলিত এলাকার পরিমাণ প্রায় ৭০% এ গিয়ে পৌঁছতে পারে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পসমূহ বন্যার তীব্রতা হ্রাসকরণে অথবা বন্যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বন্যার পানি নিষ্কাশনের উপায় হিসেবে ব্যবহূত হয়, যেগুলো শস্য উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অনুকূল অবস্থার সৃষ্টি করে।

১৯৬৪ সালে দেশজুড়ে ৫৮টি বন্যা প্রতিরোধ এবং নিষ্কাশন প্রকল্প সম্বলিত একটি মাস্টার প্ল্যান গৃহীত হয়েছিল যার আওতাভুক্ত এলাকা ছিল ৫.৮ মিলিয়ন হেক্টর। তিন ধরনের পোল্ডার বা উদ্ধারকৃত নিম্নভূমি এই বন্যা প্রতিরোধ ও নিষ্কাশন কর্মকান্ডের পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত ছিল: পোল্ডারসহ মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে পানি নিষ্কাশন; টাইডাল স্লুইস গেটের মাধ্যমে জোয়ারের পানি নিষ্কাশন; এবং পাম্পের মাধ্যমে বন্যার পানি নিষ্কাশন। ১৯৯৩ সালে সর্বমোট আর্দ্রভূমির পরিমাণ ছিল ৩.১৪ মিলিয়ন হেক্টর যার মধ্যে ১.৫৫ মিলিয়ন হেক্টরে চাষাবাদ হয়েছিল এবং ১.৩৮ মিলিয়ন হেক্টর ভূমি থেকে পানি নিষ্কাশিত হয়েছিল ভূ-পৃষ্ঠের উপরের নালীসমূহের মাধ্যমে। অধিকন্তু নিষ্কাশন ব্যবস্থা সম্বলিত সেচের আওতাধীন এলাকার পরিমাণ ১.১৭ মিলিয়ন হেক্টরে এসে দাঁড়ায়। ১৯৯৯ সালে বন্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে এমন এলাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ৪.৬২ মিলিয়ন হেক্টরে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বন্যার ক্ষয়ক্ষতি ও নেতিবাচক প্রভাব হ্রাস করণ এবং উদ্বৃত্ত পানি সেচকার্যে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে বহু সংখ্যক ভেড়িবাঁধ, বাঁধ এবং খাল নির্মাণ ও খনন করেছে। এদের মধ্যে কিছু প্রধান বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন এবং সেচ প্রকল্পসমূহ নিম্নে বিবৃত হলো।

গঙ্গা কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প (জি-কে প্রজেক্ট)  কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ এবং মাগুরা জেলার সর্বমোট ১৯৭.৪৮৬ হেক্টর ভূমি জুড়ে বিস্তৃত (পর্ব ১: ৮৪.৯৮৬ হেক্টর এবং পর্ব ২: ১১২.৫০০ হেক্টর)। ১৯৫৪ সালে প্রকল্পটির বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয় এবং ১৯৬২ সালে এটি আংশিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে। ১৯৮১ সালে চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন সমাপ্ত হয়, এতে ব্যয় হয় সর্বমোট ৮২৮ মিলিয়ন টাকা (বিরাশি কোটি আশি লক্ষ টাকা)। গঙ্গা থেকে পানি উত্তোলনের জন্য ভেড়ামারায় একটি উত্তোলন কেন্দ্র (পাম্প স্টেশন) রয়েছে। তিনটি প্রধান পাম্পের সর্বমোট উত্তোলন ক্ষমতা ১১০.৪ কিউমেক এবং অপর বারোটি সহায়ক পাম্পের সর্বমোট ক্ষমতা ৪২ কিউমেক। খাল ও নালা কেটে একটি জালিকার মতো বিস্তৃত পানি প্রবাহ প্রণালীর মাধ্যমে ১৪২.০০০ হেক্টর শস্যক্ষেত্রে পানি পরিবাহিত হয়। এই প্রণালীর প্রধান খালের দৈর্ঘ্য ১৯৩ কিমি, দ্বিতীয় পর্যায়ভুক্ত খালগুলোর সর্বমোট দৈর্ঘ্য ৪৬৭ কিমি এবং শস্য ক্ষেত্রে পানি পৌঁছে দেওয়ার সর্বশেষ পর্যায়ের নালাগুলির সর্বমোট দের্ঘ্য ৬৩১ কিমি এবং শস্যক্ষেত্রে নির্গম দ্বারের সংখ্যা ৩,৫০০ টি।

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) প্রকল্প  ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ শহরের মধ্যে অবস্থিত এবং বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা নদী দ্বারা প্রকল্পটির বিস্তৃতি সীমা নির্ধারিত। ২২.৯ মিলিয়ন টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ১৯৬৪ সালে এবং কাজ সমাপ্ত হয় ১৯৬৮ সালে। দ্বৈত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নকারী পানি উত্তোলন কেন্দ্রটি শিমরাইলে অবস্থিত, যার সর্বমোট উত্তোলন ক্ষমতা ৪.২ কিউমেক। ডিএনডি প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে ৪.৮৬০ হেক্টর জমিতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়েছে। সেচ সুবিধা পৌঁছে দেয়া গেছে ৬.০৭০ হেক্টর জমিতে, ৪.৮৬০ হেক্টর জমি থেকে পাম্পের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন এবং ২.৪৭০ হেক্টর জমি থেকে পানির নিম্নগামী প্রবণতা কাজে লাগিয়ে নিষ্কাশন সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু যেহেতু প্রকল্পটি ঢাকা শহরের সন্নিকটে অবস্থিত সেহেতু শহরায়ন ঘটেছে খুবই দ্রুত। স্বভাবতই প্রকল্পের প্রাথমিক উদ্দেশ্য কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির কাজটির সাফল্য সন্তোষজনক নয়।

কর্ণফুলি বহুমুখী প্রকল্প  রাঙ্গামাটি জেলার কর্ণফুলি নদীর উপর গৃহীত প্রকল্প। জলবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মকান্ড সম্পাদনের উদ্দেশ্যে এই বহুমুখী প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছিল। প্রকল্প এলাকার মূল অবয়বটির মধ্যে রয়েছে একটি প্রধান বাঁধ, একটি দ্বারযুক্ত নির্গমপথ, নির্গমন কার্যক্রম, জাহাজে বাহিত মালামাল পরিবহণ ব্যবস্থা এবং জলবিদ্যুৎ স্থাপনা। প্রধান বাধটি গোলাকার (rolled) মৃত্তিকা পূর্ণ কাঠামো ভিত্তিক, সর্বমোট ৩৪,৪০,৫০০ ঘন মিটার মাটি এই বাঁধ নির্মাণে ব্যবহূত হয়েছে। বাঁধটির শীর্ষ এলাকার দৈর্ঘ্য ৬১০ মিটার এবং স্রোতধারাতলদেশ থেকে সর্বোচ্চ উচ্চতা ৪৩ মিটার। বাঁধের পশ্চাৎদিকে জলাধারের জল ধারণক্ষমতা ৫.৩৩৬ মিলিয়ন ঘনমিটার। নির্গমপথের সর্বোচ্চ পানি অপসারণ ক্ষমতা ১৫.৮৬০ কিউমেক এবং নির্গমকাজ পরিচালিত হয় ১৬টি টেইন্টার নির্গম দ্বারের মাধ্যমে (প্রতিটির উচ্চতা ১১.৫১ মিটার এবং প্রশস্ততা ১২.২ মিটার)। প্রারম্ভকালে প্রকল্পটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৮০ মেগাওয়াট এবং বর্তমানে তা বৃদ্ধি পেয়ে ২৩০ মেগাওয়াটে এসে দাঁড়িয়েছে। আদতে জাহাজ বাহিত মালামাল পরিবহণ ব্যবস্থাটি তিনটি নদীর উপর দিয়ে যাওয়া মনোরেল ব্যবস্থার দড়িপথে তিনটি ট্রলির মাধ্যমে পরিচালিত হতো। পরবর্তীতে অপর একটি কার্গো (জাহাজ বাহিত মালামাল) পরিবহণ ব্যবস্থা সংযুক্ত হয়। কাপ্তাই লেকের মাধ্যমে কর্ণফুলি নদীতে সংঘটিত বন্যার উচ্চতা ৩% কমিয়ে আনা যায়। মৎস্য চাষ এবং অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ-প্রাণীর ক্ষেত্রে এই জলাধারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

উপকূলীয় ভেড়িবাঁধ প্রকল্প  এর আওতায় রয়েছে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালি লক্ষ্মীপুর, ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, বরগুনা, পিরোজপুর, বাগেরহাট, খুলনা এবং সাতক্ষীরা এই ১৪টি জেলার উপকূলীয় এলাকা। প্রকল্পের উদ্দেশ্য হলো লোনাপানির অনুপ্রবেশ থেকে এবং ভেড়ি বাঁধ ও স্লুইসগেটের ব্যবহার করে পানি নিষ্কাশনের বিস্তৃত ব্যবস্থার মাধ্যমে বর্ষাকালীন ও জোয়ার সৃষ্ট বন্যা থেকে উপকূলীয় ভূমিকে রক্ষা করা, সাথে সাথে আওতাভুক্ত এলাকায় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা। প্রকল্পের আওতাভুক্ত সর্বমোট এলাকার পরিমাণ ১.৩৮ মিলিয়ন হেক্টর, এর মধ্যে ১ মিলিয়ন হেক্টর জমি চাষযোগ্য। প্রকল্পের অধীনে ৪,০৩৭ কিমি দীর্ঘ ভেড়িবাঁধ এবং ১০৪টি পোল্ডারে ১,০৩৯টি নিষ্কাশন স্লুইস নির্মিত হয়েছে।

উত্তরাঞ্চলে নলকূপ প্রকল্প  দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও জেলায় এই প্রকল্পের অবস্থান। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রকল্পের আওতাভুক্ত এলাকায় ২৫৪ মিমি ব্যাসের এবং ৯১.৪ মিটারের উপরে গড় গভীরতায় ৩৮০টি নলকূপ বসানো হয়। এই সময়কাল ছিল ১৯৬২ থেকে ১৯৬৪ সাল। ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৯ সালের মধ্যে আরও ৮৩০টি নলকূপ এর সাথে যুক্ত হয়। পরবর্তীতে আরও ২৪০টি নলকূপ বসানো হয়। পিছনের বৎসরগুলিতে আরও অধিক সংখ্যক নলকূপ বসানো হয়েছে যার সর্বমোট সংখ্যা ১,২১৯ এ পৌঁছেছে। এসকল নলকূপের মাধ্যমে ৫৬,০৫২ হেক্টর জমি সেচের আওতায় এসেছে।

ব্রহ্মপুত্র ডান তীরবর্তী ভেড়িবাঁধ প্রকল্প  ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার ডান তীরবর্তী এলাকায় ২,৪০,১৮০ হেক্টর জমিতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পানির নিম্নমুখী প্রবাহকে কাজে লাগিয়ে পানি অপসারণের লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছে। প্রকল্পভুক্ত জমির মধ্যে ১,৫৯,০০০ হেক্টর জমি চাষের আওতায় রয়েছে। প্রকল্পটি শুরু করা হয় ১৯৬৩ সালে এবং এর কাজ সমাপ্ত হয় ১৯৬৮ সালে। ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৮ কোটি টাকা। শুরুতে কাউনিয়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত একটানা ২১৭ কিমি দীর্ঘ একটি ভেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে ব্রহ্মপুত্রে নদীভাঙনের কারণে বিভিন্ন স্থানে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।

চাঁদপুর সেচ প্রকল্প  চাঁদপুর জেলার চাঁদপুর সদর, হাইমচর, ফরিদগঞ্জ উপজেলা এবং লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ, রায়পুর ও লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলায় অবস্থিত এই প্রকল্পের আওতায় সর্বমোট জমির পরিমাণ ৫৪,০৩৬ হেক্টর। প্রকল্পটি ২৪,২৯১ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা এবং ২১,৫৭৮ হেক্টর জমিতে নিষ্কাশন সুবিধা প্রদান করছে। একটি ১০০ কিমি দীর্ঘ ভেড়িবাঁধ মেঘনা এবং ডাকাতিয়া নদীর বন্যা থেকে প্রকল্প এলাকাটিকে রক্ষা করছে। ৫৪ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ১৯৬৩ সালে এবং সমাপ্ত হয় ১৯৭৮ সালে। দ্বিবিধ উদ্দেশ্যে স্থাপিত পানি উত্তোলন স্থাপনাটি (পাম্প) চর বাঘাদিতে অবস্থিত। এর সর্বমোট পানি উত্তোলন ক্ষমতা ৩৬.৮ কিউমেক। এই পানি উত্তোলন স্থাপনা বা পাম্প ব্যবস্থার মাধ্যমে ডাকাতিয়া নদী থেকে দক্ষিণ ডাকাতিয়ায় নিম্ন প্রবাহকালে পানি উত্তোলিত হয়। ৮১১ কিমি দীর্ঘ একটি খাল প্রণালীর মাধ্যমে প্রকল্প এলাকায় এই পানি সরবরাহ করা হয়। কৃষকরা এসকল খাল থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী শস্যক্ষেত্রে পাম্পের মাধ্যমে পানি উত্তোলন করে ব্যবহার করে। দক্ষিণ ডাকাতিয়া নদীর দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত হাজিমারা রেগুলেটরের মাধ্যমে পানির প্রবাহকে কাজে লাগিয়ে নিষ্কাশন কর্মকান্ড পরিচালিত হয়। পানি উত্তোলন স্থাপনাটি পানি নিষ্কাশনেও ব্যবহূত হয়।

মেঘনা-ধনাগোদা প্রকল্প  চাঁদপুর জেলার মতলব উপজেলায় অবস্থিত। প্রকল্পের মাধ্যমে ১৯,০২১ হেক্টর জমির বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি নিষ্কাশন এবং ১৪,৪০০ হেক্টর এলাকার জমিতে সেচের পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রকল্প এলাকায় রয়েছে দুটি পানি উত্তোলন কেন্দ্র, এর একটি উধামদিতে যার উত্তোলন ক্ষমতা ৪৩.৩৫ কিউমেক এবং অপরটি কালিপুরে অবস্থিত যার উত্তোলন ক্ষমতা ২৮.৯ কিউমেক। পাম্পগুলো সেচ এবং নিষ্কাশন দ্বিবিধ উদ্দেশ্যেই ব্যবহূত হয়। প্রকল্প এলাকায় রয়েছে দু্টি বুস্টার পানি উত্তোলন কেন্দ্র, এর একটি ইসলামপুরে (উত্তোলন ক্ষমতা ২.২৬ কিউমেক), অপরটি দুবগিতে (উত্তোলন ক্ষমতা ৩.৪ কিউমেক)। প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ৬৫ কিমি দীর্ঘ বন্যা প্রতিরোধী ভেড়িবাঁধ, ২২০ কিমি দীর্ঘ সেচ খাল ও ১২৫ কিমি দীর্ঘ নিষ্কাশন প্রণালী।

মনু নদী প্রকল্প  মৌলভীবাজার জেলার মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলায় অবস্থিত। এটি একটি সেচ বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন প্রকল্প। এর আওতাভুক্ত এলাকার পরিমাণ ২২,৫৮০ হেক্টর। মনু নদীতে বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে পানি সরিয়ে ১২,০৯০ হেক্টর এলাকা সেচের আওতায় আনা হয়েছে। পানির প্রবাহকে কাজে লাগিয়ে পানিকে ধানক্ষেতে নিয়ে যাওয়া হয় ১৪৫ কিমি দীর্ঘ খাল প্রণালীর মাধ্যমে। মনু এবং কুশিয়ারাতে একটি ৫৯ কিমি ভেড়িবাঁধ সন্নিহিত ১০,৪৮০ হেক্টর ভূমিতে বন্যা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখছে এবং কুশিয়ারা নদীর বামতীরে অবস্থিত একটি ৩৫ কিউমেক ক্ষমতাসম্পন্ন পানি উত্তোলন স্থাপনা ৪.২৫০ হেক্টর ভূমির পানি নিষ্কাশন কর্মকান্ডে ব্যবহূত হচ্ছে। প্রকল্পটির নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হয় ১৯৮৩ সালে।

খোয়াই নদী প্রকল্প হবিগঞ্জ জেলায় অবস্থিত। এই প্রকল্প ২৫,৭৯০ হেক্টর এলাকার বন্যা প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে গৃহীত হয়েছে। খোয়াই নদীর ডানতীর জুড়ে হবিগঞ্জ থেকে চুনারুঘাট পর্যন্ত একটি ৪০ কিমি দীর্ঘ এবং বামতীর জুড়ে হবিগঞ্জ থেকে রাজাবাজার পর্যন্ত একটি ৪৭ কিমি দীর্ঘ বন্যা প্রতিরোধী ভেড়িবাঁধ নির্মিত হয়েছে।

পাবনা সেচ প্রকল্প  পাবনা জেলায় অবস্থিত এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত সর্বমোট এলাকার পরিমাণ ১৯৬,৬৮০ হেক্টর। ১৯৭১ সালে প্রকল্পের কাজ শুরু হয় এবং সমাপ্ত হয় ১৯৯২ সালে। ব্যয়িত অর্থের পরিমাণ ৩৮৪ কোটি টাকা। বেড়া উপজেলার হুরাসাগরের ডান তীরে অবস্থিত পানি উত্তোলন কেন্দ্রের মাধ্যমে সেচ এবং নিষ্কাশন উভয় কর্মকান্ডই পরিচালিত হয়। উত্তোলিত পানির প্রবাহকে কাজে লাগিয়ে খাল কেটে ধানক্ষেতে পানি সরবরাহ করা হয়। প্রকল্পের সেচের আওতায় আসা জমির পরিমাণ ২১,৮৬২ হেক্টর। কইতলায় অবস্থিত উত্তোলন কেন্দ্রের মাধ্যমে ১৩৮,৮৬৪ হেক্টর ভূমির পানি নিষ্কাশন কর্মকান্ড পরিচালিত হয়।

গোমতী প্রকল্প  কুমিল্লা জেলায় অবস্থিত। গোমতী নদীর উভয় তীরে নির্মিত ৬৭ কিমি দীর্ঘ ভেড়িবাঁধ ৩৭,৪৪০ হেক্টর ভূমিতে বন্যা প্রতিরোধ করছে। প্রকল্পের আওতায় গোমতী থেকে পাম্পের মাধ্যমে উত্তোলিত পানি ১,১০০ হেক্টর জমিতে শস্যক্ষেত্রে সেচের কাজে ব্যবহূত হচ্ছে।

মুহুরি সেচ প্রকল্প  ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া, ফেনী সদর, পরশুরাম এবং সোনাগাজী উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত এই সেচ প্রকল্পের বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয় ১৯৭৮ সালে এবং সমাপ্ত হয় ১৯৮৬ সালে। প্রকল্পে সর্বমোট ব্যয়ের পরিমাণ ১৫৬ কোটি ৮৬ লক্ষ টাকা। সোনাগাজীতে ৪০টি নির্গমন পথ বিশিষ্ট একটি রেগুলেটর রয়েছে মুহুরি নদীর উপর, যা বর্ষা মৌসুম উত্তর সময়ে সেচের জন্য পানি ধরে রাখার কাজে ব্যবহূত হয়। লো-লিফ্ট পাম্পের সাহায্যে পানি উত্তোলন করে ধান ক্ষেতে পানি সরবরাহ করা হয়।

তিস্তা বাঁধ প্রকল্প (পর্ব ১)  রংপুর, লালমনিরহাট এবং নীলফামারী জেলায় অবস্থিত। প্রকল্পটির আওতাভুক্ত সর্বমোট এলাকার পরিমাণ ১,৩২,০০০ হেক্টর, এর মধ্যে সেচযোগ্য এলাকার পরিমাণ ১,১১,৪০৬ হেক্টর। তিস্তা নদীর উপর বাঁধ নির্মাণ করে প্রবাহের দিক পরিবর্তন করে নদীর পানিকে সেচ কার্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। খাল খনন করে শস্য ক্ষেত্র পর্যন্ত সেচের পানি নিয়ে যাওয়া হয়। প্রধানত বর্ষা মৌসুমে সম্পূরক সেচ হিসেবে এই প্রকল্পের আওতায় সেচকার্য পরিচালিত হয়। বাঁধটির দৈর্ঘ্য ৬১৫ মিটার। বাঁধের সাথে যুক্ত রয়েছে ৪৪টি জলকপাট, যাদের সম্মিলিত অপসারণ ক্ষমতা ১২,৭৫০ কিউমেক। খালের প্রধান রেগুলেটরের দৈর্ঘ্য ১১০ মিটার এর সাথে ব্যাসার্ধ আকারে যুক্ত রয়েছে ৮টি দ্বার, এগুলোর সর্বমোট পানি অপসারণ ক্ষমতা ২৮০ কিউমেক। প্রকল্পের অন্যান্য অংশগুলি হলো: (১) কাদামাটি বা পলি ধরে রাখার স্থান বা ফাঁদ, (২) ৬১০ মিটার দীর্ঘ বন্যা উপসরণি (flood bypass) (৩) ৮০ কিমি দীর্ঘ বন্যাপ্রতিরোধী ভেড়িবাঁধ, (৪) ৩৪ কিমি দীর্ঘ প্রধান খাল, (৫) ১২০ কিমি দীর্ঘ প্রধান মধ্যবর্তী খালসমূহ, (৬) ৩৬০ কিমি দীর্ঘ মধ্যবর্তী পর্যায়ের খালসমূহ, (৭) তৃতীয় পর্যায়ের শস্য ক্ষেত্রে পানি সরবরাহকারী খালসমূহ যার সম্মিলিত দৈর্ঘ্য ৫৯০ কিমি, (৮) ৯৬০ কিমি দীর্ঘ নিষ্কাশণ প্রণালী, (৯) ৩৯১ টি সেচ কাঠামো এবং (১০) নিষ্কাশন কাঠামো। প্রকল্পটি সম্পাদিত হয় ১৯৯৩ সালে।

ঢাকা সমন্বিত বন্যা প্রতিরক্ষা প্রকল্প  ঢাকা শহরের পশ্চিম অংশে গৃহীত এই প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য হলো রাজধানীকে বন্যা মুক্ত রাখা, নাগরিক সুযোগসুবিধা এবং পরিবেশের উন্নয়ন বিশেষ করে শহরে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক উন্নয়ন তরান্বিত করা। এই প্রকল্পে তিনটি নির্বাহী সংস্থা এক সাথে কাজ করছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বন্যা থেকে প্রতিরক্ষামূলক কর্মকান্ড সম্পাদন করেছে। ঢাকা পানি ও পয়নিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য দায়িত্ব প্রাপ্ত সংস্থা এবং পরিবেশগত উন্নয়নের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা হলো ঢাকা সিটি কর্পোরেশন। প্রকল্পের আওতাভুক্ত এলাকার পরিমাণ ১৩৬ বর্গকিমি এবং সমগ্র শহরের জনসংখ্যার ৮৭% প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ শহরের বাণিজ্যিক ও শিল্প সম্পদের ৯৫% প্রকল্পের আওতাভুক্ত হয়েছে।

দ্রুত বাস্তবায়ন প্রকল্প  ওলন্দাজ সাহায্যপুষ্ট এই প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ১ এপ্রিলে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে ক্ষুদ্র শ্রমঘন, দ্রুত উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এই কার্যক্রম চলে ২০০০ সাল পর্যন্ত। এই প্রকল্পে সুইডিশ সরকারের অংশগ্রহণের সূত্রপাত ঘটে ১৯৮১ সালে এবং তা ১৯৯২ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এই বৎসরগুলিতে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৮৮টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত সর্বমোট এলাকার পরিমাণ ৪,৬৩,২৫০ হেক্টর। যার জন্য ব্যয় করা হয়েছে ২৬০ কোটি ৬৬ লক্ষ টাকা। 


Share with :
Facebook Facebook